লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি ও ধারা সমূহ |

লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি ও ধারা সমূহ |

লাহোর প্রস্তাব মূলত একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মুসলিম লীগ লাহোরে এই অধিবেশন শুরু করেছিল। আমরা লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবঃ-

নেহেরু রিপোর্ট, ১৯২৮

ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতিতে এই রিপোর্টটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করলেও রিপোর্টটি ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কোন উদ্দেশ্য উল্লেখ না থাকার কারণে মুসলিম লীগ ও খিলাফত কমিটির দাবির জন্য একটি নতুন সাব কমিটি গঠন করা হয়।

তবে দুঃখের ব্যাপার হলেও সত্য এই যে উক্ত কমিটিতে মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খুব সতর্কের সঙ্গে দেখা হয়। যার ফলে ভারতে অবস্থিত মুসলমান নেতৃবৃন্দ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথ পরিহার করে দেয় এবং মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য চিন্তা-ভাবনা শুরু করে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের কার্যকারিতা

ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয় হাজার ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন  আইন। তৎকালীন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এটিকে গ্রহণ করতে পারেনি। অপরদিকে উক্ত আইনের অধীনে ১৯৩৭ সালে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়। এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ভাবে মন্ত্রিসভার গঠনের প্রস্তাব করলেও কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে দেয়।

 যদিও বাংলা এবং পাঞ্জাব প্রদেশগুলোতে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল। কংগ্রেসের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠনের কারণে বিভিন্ন সরকারি অফিস আদালতে কংগ্রেসের পতাকা ওড়ানো হয়। তার সাথে বন্দেমাতারাম সংগীত পরিবেশন এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কংগ্রেসের এ ধরনের কার্যক্রমের কারণে মুসলমান সমাজ হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং বিভিন্ন স্থানে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল।

দ্বিজাতি তত্ত্বঃ-

বিশ্লেষণ মনে করেন যে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিক স্থাপনের মূল কারণ হয়েছিল জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব। কংগ্রেস সভাপতি ঘোষণা করেছিল যে ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল এই দুইটি দলের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায় একটি কংগ্রেস অপরটি হল সরকার, এবং বাকি যে দলগুলো আছে তা কংগ্রেস অন্তর্ভুক্ত।

এ ধরনের বক্তব্যে মুসলমান নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত রাগান্বিত হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্না হিন্দু মুসলিম সমস্যার সমাধানের জন্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করলেও তা ব্যর্থ হয়। যার ফলে তিনি একটি বিষয় উপলব্ধি করতে পারেন যে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি।
এর কারণে তাদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রয়োজন। এবং প্রয়োজন একটি ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের। তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত ঘোষণা করেন যে এই উপমহাদেশে ভারতীয় মুসলমানগণ তৃতীয় একটি দল এবং তারা একটি স্বতন্ত্র জাতি।
উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে আল্লাহর প্রস্তাবের কারণেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয় এবং তৎকালীন পাকিস্তানের নানা আন্দোলন তীব্র এবং তীব্র কর হয়ে ওঠে সেই সাথে এক পর্যায়ে এসে পাকিস্তান ভেঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের জন্ম হয়।
ব্রিটিশভারতের ইতিহাসে যে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো লাহোর প্রস্তাব। লাহোর প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ। মুসলিম লীগ তাদের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তরপূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এ প্রস্তাব উপস্থাপন করে।

লাহোর প্রস্তাবের ধারা সমূহ

লাহোর প্রস্তাব একটি বিষয় উল্লেখ করা হয় যে কোন সাংবিধানিক পরিকল্পনা কার্যকর করা যাবে না বা মুসলমানদের কাছে সেগুলো গ্রহণযোগ্য হবে না যদি তা নিম্নরূপ মূলনীতির উপর পরিকল্পিতভাবে না তৈরি করা হয়।

  • কিছু বিশেষ অঞ্চলকে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী করতে হবে।
  • উক্ত অঞ্চলগুলোর সীমা পরিবর্তন করতে হবে যাতে করে ভারতবর্ষের যে সকল স্থানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সে জায়গা গুলোতে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা পায়
  • স্বাধীন রাষ্ট্র সমূহ গুলোর অঙ্গরাজ্যগুলো হতে হবে অবশ্যই স্বাধীন সার্বভৌম এবং স্বায়ত্তশাসিত।

এছাড়াও এই প্রস্তাবে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয় যেমন অঞ্চলগুলোর সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিক শাসনতান্ত্রিক এবং অন্যান্য অধিকারগুলো শর্ত সংরক্ষণের জন্য তাদের সাথে পরামর্শ করে কার্যকর বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যবস্থা শাসনতন্ত্র করতে হবে।

উপসংহারঃ- পরিশেষে সুস্পষ্ট ভাবে বলা যায় যে উপযুক্ত বিষয়গুলো ছাড়া লাহোর প্রস্তাবে আরো বেশ কিছু বিষয় ছিল তা হল প্রতিরক্ষা পররাষ্ট্র যোগাযোগ ও প্রয়োজনমতো অন্যান্য বিষয়গুলোতে সর্ব ক্ষমতার ব্যবহার করে অঞ্চলগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকতো। আমরা যদি লাহোর প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব খুঁজে পাবো।

Leave a Comment